হানিফা ডিন এর “The Crescent and the Pen: The Strange Journey of Taslima Nasreen” আলোচনার এর অনুবাদ
মূল আলোচনাঃ শাকিরা হুসেইন; অনুবাদঃ হিরন্ময় গোলদার

একজন তরুণী, মুসলিম-প্রধান একটি সমাজ থেকে পাড়ি জমিয়েছিল ইউরোপে, যেখানে পেয়েছিল সে নিরাপত্তা এবং খ্যাতি – তবে নতুন খুঁজে পাওয়া সেই আশ্রয়ের আনুকূল্য তাকে হারাতেও হয়েছিল। না, এটি আয়ান হারসি আলীর জীবনী নয় ( যা প্রকাশিত হতে যাচ্ছে পরের মাসে) বরং এটি বাংলাদেশের একজন লেখিকা তসলিমা নাসরিনের গল্প।
১৯৯৪ সালে, নাসরিন প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসেন, যখন তাঁর উপন্যাস লজ্জা – যেখানে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাতে একটি মসজিদ ধ্বংস হবার ঘটনার রেশ হিসাবে বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা বর্ণিত হয়েছিল – নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ সরকার। তার সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায় যখন ভারতীয় একটি পত্রিকা কোরানকে সংশোধন করতে হবে, তার এমন একটি মন্তব্য প্রকাশ করে (পরে এমন কোন মন্তব্য তিনি করেছেন বলে অস্বীকার করেন)। তাকে গ্রেফতার করার জন্য পরোয়ানা জারি হয় এবং সাধারণ জনতা তার মৃত্যু কামনা করে বিক্ষোভ প্রকাশ করে। তসলিমা সুইডেনে পালিয়ে যান।
এরপর, অনেকের মত আমিও তসলিমার গল্পটি অনুসরণ করতে পারিনি। কিন্তু অস্ট্রেলিয় লেখিকা হানিফা ডিন এই বিবরণ মতে, ইউরোপে পৌঁছানোর পরেই তসলিমার গল্পটি আরো বেশী কৌতুহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছিল। ‘The Crescent and the Pen’ বইটি যত না বাংলাদেশের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কদর্যরুপের প্রতিচিত্র, তার চেয়েও বেশি এটি পশ্চিমাদের ইসলামের প্রতি বৈশিষ্টসূচক দৃষ্টিভঙ্গী, উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার রোমান্টিক প্রয়াস এবং তাদের নির্বাচিত নায়িকা যে ক্রটিহীন নয় সেই বিষয়ে উদ্ধারকারীদের মোহভঙ্গ হবার একটি নিরীক্ষা ।
নিজেকে সবার বিরাগভাজন করে তোলার একটি স্বভাবগত প্রতিভা আছে নাসরিনের। বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থীদের পাশাপাশি অনেক প্রগতিশীল সামাজ-কর্মীও তাকে অপছন্দ করেন। তার ব্যক্তি-অহমিকা, অন্যদের কাজকে স্বীকৃতি না দিতে পারার তার ব্যর্থতা এবং নিজের কর্মকান্ডের পরিণতি সম্পর্কে দূরদর্শিতার অভাবের জন্য তাঁকে সমালোচনার সম্মুখিন হতে হয় । বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলনের শক্তিশালী ইতিহাস থাকা স্বত্তেও নাসরিন বিশ্বের কাছে, নিজেকে , বাংলাদেশের একমাত্র প্রথাবিরোধী-ভিন্নমতের সোচ্চার কন্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন।
আত্মকেন্দ্রিক, স্পষ্টবাদী এবং পুরুষ সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সর্বনাশা রুচিবোধ সহ নাসরিনের বাংলাদেশের মত রক্ষনশীল সমাজের একটি দেশে দূর্ভোগে পড়ার করার কথাই ছিল…। ইউরোপীয় মানবাধিকার কর্মীরা যারা তার জন্য সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন তাদের খেয়াল ছিল না যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো পশ্চিমেও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে (যদিও অপেক্ষাকৃত কম বিপজ্জনক)।
নাসরিন ইউরোপে পৌঁছায় ইসলামি পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে মুক্তমতের একজন ফরমায়েশী নায়িকা হিসেবে। তার কিছু সাবেক সমর্থক (হানিফা) ডিন এর কাছে স্বীকার করেছেন যে, তাকে নিয়ে তাদের প্রত্যাশা ছিল অবাস্তবরকমের উঁচু পর্যায়ে। তারা ভেবে নিয়েছেলেন যে, নাসরিন উপমহাদেশের সংকীর্ণতামুক্ত বিশ্বজনীন অভিজাত শ্রেণির সদস্যদের মত কেউ হবেন, রুশদীর মত কেউ, নিদেনপক্ষে যিনি লন্ডন এবং নিউ ইয়র্কে কলকাতার অথবা ঢাকার মতই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।
কিন্তু, একজন ডাক্তার হিসেবে শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও, নাসরিন এসেছেন মফস্বলের তুলনামূলকভাবে সাদামাটা পরিবার থেকে। সীমাবদ্ধ ইংরেজি দক্ষতা তাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল, এবং ধর্মীয় গোড়ামীর বিরুদ্ধে তাঁর নিজস্ব যুদ্ধের প্রসঙ্গ ব্যতিরেকে আর কোন বিষয়েই বিতর্কে অংশগ্রহন করার ক্ষেত্রে তার না ছিল যোগ্যতা, না ছিল ইচ্ছা। ইউরোপীয় সাহিত্য বিষয়ে ধারণা না থাকার কারণে সাহিত্য সমাজের অযোগ্য সদস্য হিসাবেই তাকে বিবেচনা করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি বাংলা ভাষার এমন লেখক, যিনি যথেষ্ট সঙ্গত কারণে অনুভব করেছিলেন যে, তার মাতৃভাষার সাহিত্য তাকে যথেষ্ট পরিমান প্রজ্ঞাবান করেছে ।
সর্বোপরি, নাসরিনের ইউরোপিয় উদ্ধারকর্তারা তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করেছিলেন এবং যদিও কোনো ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ অনুভব করার ক্ষমতা তার ছিল না। ইউরোপে তিনি ছিলেন শোচনীয়ভাবে নিঃসঙ্গ, এবং তার ছিল একটি সুদৃঢ় মনোভাব যে সব ধরণের সুবিধা পাবার অধিকারই তার আছে। যখন সেই সুবিধাগুলো তিনি আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তখন তার উদ্ধারকর্তাদের বিরুদ্ধে সেই একই একগুঁয়ে স্পষ্টবাদীতার অবস্থান নেন – যা এতদিন তিনি ধর্মীয় গোঁড়াদের প্রতি প্রদর্শন করে এসেছিলেন।
শিষ্টাচার সংক্রান্ত তাদের ধারণার সাথে খাপ খাইয়ে নেবার ক্ষেত্রে নাসরিনে ব্যর্থতা দ্বারা তাদের নিজেদের আদর্শবাদী অবস্থান ধাক্কা খাবার পর, তার কিছু ইউরোপীয় সমর্থক বাংলাদেশে সত্যিকারভাবে তিনি ঠিক কতটুকু বিপদের সন্মুখিন হয়েছিলেন সেই প্রশ্নটি পুনঃপর্যালোচনা করতে শুরু করেন। নাসরিন নিজেই তার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন বিক্ষোভের স্ববিরোধী এবং অতিরঞ্জিত বিবরণ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে গেলেই জনসম্মুখে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে এমন কথা কানাডার শ্রোতাদের জানানোর এক মাস পরেই তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।
তার সেই প্রত্যাবর্তন ছিল স্বল্প সময়ের জন্য; যদিও খুন হবার পরিবর্তে তিনি সুরক্ষা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে, তবে তিনি অব্যহতভাবেই নানা বিতর্ক আর আইনী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন । তার বিরুদ্ধে মূল হুমকিটি যদিও সত্য, তবে সেটি অনেক উন্নয়নশীল সমাজের মানদন্ডে অতিমাত্রার অথবা অস্বাভাবিক কোন কিছু ছিল না । তার ইউরোপিয় সমর্থকগোষ্ঠীর প্রচারণা ( তার বাংলাদেশী আইনজীবীদের উপদেশ অমান্য করে) বাংলাদেশকে ঢালাওভাবে একটি হিংস্র ও আদিম সমাজ হিসাবে ব্যঙ্গাত্মকভাবে চিত্রায়িত করেছিল। আর এটি করার মাধ্যমে, তারা নাসরিনের রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার বিষয়টি নিশ্চিৎ করেছিল ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রতি বৈরভাবকে বহুগুনে বাড়িয়ে দেবার মাধ্যমে এবং একটি মাত্র জায়গা, যেখানে তিনি সত্যিকারভাবে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন, সেখানে ফেরার কোন সম্ভাবনাকেও সেটি বন্ধ করে দিতে সাহায্য করেছিল।
স্ববিরোধিতার পুঞ্জিভূত রুপ হিসাবে নাসরিনকে আমরা দেখতে পাই: লাজুক কিন্তু সর্বদা মনোযোগ-প্রত্যাশী, স্বাধীন কিন্তু একা কিছু করতে অক্ষম, একজন মানবাধিকার কর্মী, কিন্তু বলা হয় যিনি তার শিশু গৃহপরিচারিকার সাথে দুর্ব্যবহার করেছিলেন, একজন বিদ্রোহী যে লোকসম্মুখে নিজের পারিবারিক মূল্যবোধের নিন্দা করে বেড়ান কিন্তু ঠিকই যে নির্বাসনের একাকিত্বের সময়ে তাদের জন্য অর্থ প্রেরণ করেছেন এবং সারারাত তাদের সাথে ফোনে কথা বলে কাটাতেন: যে কোন সমাজের প্রেক্ষিতেই সে একজন অত্যন্ত জটিল মহিলা ।
বেশ কয়েক বছর ধরে যে ঐকান্তিক অধ্যবসায়ের সাথে (হানিফা)ডিন নাসরিন এর গল্পটি তিনটি মহাদেশে অনুসরণ করেছেন তার জন্য তিনি পুরো কৃতিত্ব পাবার যোগ্য। কখনো আমার মনে হয়েছে তার এই সাহিত্যিক গোয়েন্দা গল্প এর গোপন বিষয়গুলো খুব সহজে উন্মোচন করেনি এবং বাড়তি অসংখ্য বিষয়বস্তু এটি ধারণ করেছে। কিন্তু, এখন যেহেতু পশ্চিম মুসলিম বিশ্বের আদর্শিক ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে উদারভাবে আশ্রয় দিতে বাহু প্রসারিত করছে, সেক্ষেত্রে এই বইটি হতে পারে একটা সময়োপযোগী অভিজ্ঞান যে ভিন্নমতাবলম্বীরা প্রতাড়ক পশুর মত আত্মপ্রকাশ করতে পারে ভন্ড সাধু না হয়ে।
শাকিরা হুসেইন Australian National University এর faculty of Asian studies এর একজন সিনিয়র লেকচারার এবং webzine Shalom Pax Salam এর সম্পাদক।
Leave a comment