বই পড়ার আগ্রহটা কৈশোর থেকেই ছিল। বইয়ের পোঁকা বলতে যা বোঝায় সেটা হবার অবকাশ অবশ্য পাই নি। মাথায় ছিল ডক্টর-ইঞ্জিনিয়ার হবার গুরু দায়িত্ব। কোন মা বাবা চায় ছেলে পোঁকা হয়ে উঠুক। কীট-পতঙ্গের মত জীবন যাপন করুক! তা যতই রবি ঠাকুর শহুরে জীবনের আইরনিটা দেখে মুচকি হাসুন না কেন! ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ…। এ সমাজ পশু সহ্য করতে পারে, পোঁকা নয়। আর বইয়ের পোঁকা তো ভয়াবহ প্রাণি। দ্বিমাত্রিক জগতের সাদাকাগজ সদৃশ শুণ্য মানুষেরা তাই ত্রিমাত্রিক পোঁকাকে সহ্য করতে পারেন না, তা সে পোঁকা বইয়ের পাতা যতই ফুটো করুক না কেন।
এই যা! লিখতে বসলাম গল্প, শুরু করে দিলাম প্রাবন্ধিক-প্যাচাল, ফিজিক্সের ফ্যাচফ্যাচানি। আবার শুরু করছি।
-“হ্যা, যা বলছিলাম, শমসের ভাই। বই পড়ার আগ্রহটা কৈশোর থেকেই ছিল, পড়েছিও। তবে ঠিক বইয়ের পোঁকা বলতে যা বোঝায় সেটা হওয়া হয়ে ওঠে নি। তবে তেমন হবার ইচ্ছে ছিল খুব। আমার ইচ্ছে পূরনও হলো। আর লুকিয়ে লুকিয়ে যেন বই পড়া না লাগে, তার জন্যই যেন পাবলিক লাইব্রেরীর লাইব্রেরিয়ানের চাকরীটাই রাতারাতি পেয়ে গেলাম। একে ভারতীয় বাংলা সিরিয়ালের ভাষায় বলে ‘সোনায় সোহাগা’, অতিউৎসাহি আত্মিয়দের ভাষায় বলে ‘সমাজে মুখ দেখাব কি করে?’, স্কুলের শিক্ষকদের ভাষায় ‘এহ! এসেসসি ইন্টারে পেল গোল্ডেন, কি লাভ হলো শুনি, চাকুরীর নামে যদি এমন অশ্বডিম্বই পারতে হবে!”
-“হা হা হা… এভাবে নিশ্চয়ই ওনারা বলেন নি, আপনি মজা করছেন ভাই। মজার মানুষ আপনি। হা হা হা…।” আমি শমসের ভাইকে মনে করিয়ে দিলাম যে এটা লাইব্রেরী এভাবে বজ্রপাতের মত ফেঁটে পরতে নেই।
-“আমি হয়ত মনের ভাষা বুঝতে পারি। আসলে স্যারেদের আত্মিয়দের সমাজস্থদের দোষ দেব না। এরা সারাজীবন অনিয়ম করে ভাজাপোড়া খেয়ে শরীরের একেবারে ‘খ্যাতা পুরে’ ফেলে- তাই চায় কাছের বাচ্চা-কাচ্চারা বড় হয়ে ডাক্তার হোক, আর তাদের মিথ্যে করে বলুক। ‘আরেহ! কিস…সু হয় নি আংকেল। আপনি তো এখনও ইয়াং ম্যান। আমার তো মনে হয় আপনি যখন আপনার মেয়েকে নিয়ে কি-যেন-গার্লস-কলেজ-এ নিয়ে যান তখন মেয়েরা আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে’। আর চায় ইঞ্জিনিয়ার হোক বা ব্যাংকার। যেন সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে কোনো মতে একটা ফ্ল্যাট বা দু-তলার ফাউন্ডেশনে ছতলা বিল্ডিং করতে পারে। কি রড লাগবে, কি সিমেন্ট লাগবে এসব ইঞ্জিনিয়াররা ছাড়া কি কেউ বোঝে? আর ব্যাংকের লোন এর ব্যাপারটা এত জটিল। কে বলেন- সেই ক্লাস ফাইভ এর বার্ষিক-সুদের-হার-না-জানি-সুদ-কষার অংক মনে রেখে বসে আছে।”
এবারও শমসের ভাই হাসছেন। একই ভাবে। আগের মতই তার শরীর দুলছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো- কে যেন ‘মিউট বাটন’ চেপে রেখেছে। আমি একটু ডিস্টার্বড ফিল করলাম। ভাবুন তো একটা পেট্রোল চালিত স্যালো-মেশিন কাঁপছে, কিন্তু আপনি কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না। এটা কি মানতে পারা যায়? আমি পারছিলাম না। আমি বলতে লাগলাম- “ঠিক এই কারনেই আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি নাই, কারন আমি জানি বাজারের কোনো ব্র্যান্ডই ভাল না। ব্যাঙ্কারও হই নি, আমার ভাগনী লাবিবা যে এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে, আমাকে দেখে ভেংচি কাটবে বলে…।”
শমসের ভাইয়ের ফোন বাঁজছে, উনি রিসিভ করেই ক্ষনে ক্ষনে কেঁপে কেঁপে উঠছেন। লাউড স্পিকারে নেই ফোন। তাও আমি শুনতে পেলাম,- হারপিক… কদুর তেল… আলু-পটল। বাজারের ফর্দ। কথা শেষ।
-“আরেহ নাহ! ঠিক আছে শমসের ভাই। আরেক দিন কথা হবে।”
শমসের ভাই চলে যাচ্ছেন। সন্ত্রস্ত হয়ে। আচ্ছা বিয়ে করে কি পুরুষেরা লোডেড রিভলবার গলার দিকে তাক করে পথ চলে? নাহ! ভুল উপমা। দুষ্টু ছেলেরা অন্যভাবে নেবে বিষয়টা। আচ্ছা, এসব বাদ দিয়ে বরং শমসের ভাই এর নাম এর প্রসঙ্গে বলি। এই নামটা আমাদের কাছে খুব প্রিয় ছিল স্কুল জীবনে। বিশেষত নবম ও দশম শ্রেণিতে। বাংলা রচনায় বরাবরই অনেক তথ্য- উপাত্ত-উদ্ধৃতি-বানী দেয়া লাগে। লেখার মান যাই হোক, পয়েন্ট আর ওগুলো বেশি করে থাকলেই তখনকার ভাষায় ‘ঝাক্কাস’ মার্কক্স। অধিকাংশ রচনার বিষয়বস্তু অপ্রিয় ও আগ্রহব্যাঞ্জক ছিল বিধায় ওসব মুখস্তও করতে ভাল লাগত না। ফলে যা হবার হত, বানিয়ে বানিয়ে পুরো রচনা লেখা ও কোটেশন দেয়া লাগত। আমার মুক্তিদাতা ছিলেন ডঃ শমসের মাওলা। বিশিষ্ট সবজান্তা-শমসের। দি গ্রেটেস্ট স্কয়ার পলিম্যাথ। পরবর্তিতে একটা সহায়িকা বইতেও তার নাম পাই। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার অস্তিত্ব কোথাও খুঁজে পাই নি। কে জানত কোন এক শমসের এর সাথে আমার দেখা হয়েই যাবে। যদিও এর সাথে আমার কৃষ্টি’র শমসেরের তেমন কোন মিল নেই। নাম ছাড়া।
উনি চলে যাওয়ার পর আবার বই এর পাতায় মনযোগ দিতে যাব এমন সময় মেয়েটির দিকে আবারও চোখ পড়ল। সে এবার অন্য জায়গায় বসেছে। না না, আপনারা বিচলিত হবে না। এতক্ষন রামায়ন পড়ে সবশেষে সীতার নাম কেন আনছি ভাববেন না। ওর দিকে আগেও চোখ পড়েছে। সত্যি বলতে ইচ্ছে করেই তাকিয়েছি। মেয়েটা হয়ত সেটা বুঝতে পেরেই ইতোমধ্যে কয়েকবার জায়গা পাল্টেছে। এর কি কারন হতে পারে আপনারাই ভাবুন। আমি বরং দেখি। এবার সে বসেছে একেবারে আমার সামনা সামনি। বেশ কাছে এসে। আপনারা যারা পাবলিক লাইব্রেরিতে আসেন, তারা তো জানেন কতগুলো লম্বা সারি। মেয়েটা আমার ডেস্ক বরাবর সারির দু নম্বর টেবিলে। চুল খুলে দিয়েছে। তাকে কেমন লাগছে তা বলে ছোটগল্প বড় না করি। নারীর রুপ নিয়ে যত লেখা হয়েছে তার কাগজ পেচিয়ে তা দিয়ে দড়ি বানিয়ে চাঁদকে ফাঁসিয়ে পৃথিবীতে টেনে আনা যাবে। আ… তাতে অবশ্য যেসব প্রেমিকেরা তাদের প্রেমিকাদের চাঁদের মত সুন্দর বলে অভ্যস্ত, তারা বিপদের পরে যাবে। আপনারা হয়ত জানেন চাঁদ দূর থেকেই বেশি সুন্দর। সারা শরীর গর্তবহুল কিনা। তাই মেয়েটার সৌন্দর্য্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকছি।
সে আমার দিকে বিকারহীনার ন্যায় তাকিয়ে চুল ঠিক করছে দুহাত বারবার মাথায় তুলে। বিষয়টা ঠিক এই পরিবেশের সাথে যায় কিনা সে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আসুন দেখি আমার মত আর কেউ মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে কিনা। না। এর কারন একের অধিক হতে পারে। এই মেয়েটি প্রায় প্রতিদিন আসে বই পড়তে। তেমন কারও সাথে কথা বলে না। কেউ হয়ত সাহস করে না। তারও অনেক কারন থাকতে পারে।
এতদিনে সব শেলফ এর সম্মক-জ্ঞান মেয়েটির নখ-দর্পনে থাকার কথা। সে বই পড়ার ব্যাপারেও মারাত্নক মনযোগী, সিরিয়াস। লাইব্রেরীতে তার অবস্থানকালীন কাজগুলোর একটি বিষয়ই একটু খাপ-ছাড়া। তাহলো তার বার বার স্থান পরিবর্তন। কারন টি কি আমি? আমি বিবাহিত। টুকিটাকি লেখালেখি করি। গল্প কবিতা। কয়েকজন ভক্ত বা ভড়ং-ভক্তও আছে। আমাকে তারা কবিও বলে। এক সম-বয়সী বড়-ভাই তো আমাকে ভন্ডও বলে, তার কাছে- “কবি মানেই ভন্ড”। আমি বার বার প্রতিবাদ করি। কিন্তু এই মেয়েটির ক্ষেত্রে কি আমি তাঁর বানীটাকে শক্তি হিসেবে নেই। মানে হলো, কবি মানেই ভন্ড, তাই আমি বিবাহিত হয়েও বিশেষ এই মেয়েটির দিকে তাকানোটা সেদিক থেকে সমর্থনযোগ্য। ভাবনাটা মাথায় আসে। কিন্তু মেয়েটির দিকে তাকালে সে ভাবনা গলে উবে যায়।
মেয়েটি যখন আমার দিকে পাশ ফিরে বসে- দুহাত ওপরে তুলে, বই এর ওপর থুতনি গুঁজে, অগাস্ট রোডিনের ‘দি থিংকার’ ভাস্কর্যের মত, তখন ওর শরীরে বাক আমাকে বুক-ওয়ার্ম থেকে অন্যকিছু করে তোলে ভেতরে ভেতরে। আবার সে যখন বইয়ের শেলফ থেকে শেলফ হাটে, নিঃশব্দে, যেন মনে হয় কোনো বনানীর গহীনে কুয়াশায় একটি মেয়েকে এই দেখা যাচ্ছে এই হারাচ্ছে। কল্পনাটা খুব হিপনোটিক, তখন মনে হয়- এর সাথে আমি দোজখে যেতেও রাজি। ভাবি, মেয়েটা কিভাবে এমন হাটে? আপনারা হয়ত ভাবছেন আমি পার্ভার্ট! হয়ত তাই। কিন্তু লাইব্রেরীর আর কেউ কিন্তু বিষয়টা আন্দাজ করে নি। বা করলেও কোনো বিশেষ কারনে বিষয়টা পাত্তা দেয় না। সে বিশেষ কারণা কি? বামন হয়ে চাঁদে হাত দেয়ার কথা ভাবছি বলে? নাকি- মেয়েটার ব্যক্তিত্ত্বের শক্তিতে সবাই মাথা নত রাখে বলে? লাইব্রেরীতে অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত। মাথা নত রাখা।
মেয়েটা আবারও নড়ছে। এখন কামিল ক্লদের শৈশবের পবিত্র মুখটার মত লাগছে মেয়েটির মুখ। ওর বয়স কি বারো? মোটেও না। পাঠক, মেয়েটি আমার দিকেই আসছে। শুশ…
-“কটা বাজে?” শুনে আমার শরীরে শিহরণ খেলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না, নারী কন্ঠ শুনে আমি অভ্যস্ত। বিবাহিত কিনা।
-“সাড়ে চার।”
-“উত্তর চাই নি। এত বড় একটা দেয়াল ঘড়ি টাঙ্গানো আপনার পেছনে।”
– “ও হ্যা,… আপনি চলে যাবেন। আপনার গতসপ্তাহের চাহিদা মত বইটা আনিয়েছি। আমাদের কালেকশনে ছিল না তাই দেরি হলো একটু।”
– “ঠিক আছে, ধন্যবাদ।” বলে মেয়েটি স্যাম হ্যারিস এর ‘লায়িং’ বইটা স্বচ্ছন্দে তুলে নেয়। দেখে অপলক।
-“আজকে কোন লিস্ট?” জিজ্ঞেস করি আমি।
-“হ্যা।” তারপর নির্লিপ্তভাবে, -“তার আগে বলুন, আপনার চোখে কি কোন সমস্যা হচ্ছে? দূর থেকে ওভাবে কপাল কুঁচকে আমাকে দেখেন কেন?” শুনে আমি কি উত্তর দেব বের করবার আগেই সে আমাকে একটা কাগজের টুকরো ধরিয়ে দেয়। তারপর আমার চোখের মণি ভেদ করে অনন্য দক্ষতায় তার চোখের কি এক অমোঘ বার্তাবাহী রশ্মিগুচ্ছো প্রবেশ করিয়ে নিজের ব্যাগটা তুলে চুল নাচিয়ে চলে যায়। আমি তাকিয়ে দেখি দেখতে থাকি মেয়েটি দৃষ্টির বাইরে যাওয়া পর্যন্ত। মেয়েটি কিভাবে এমন করে হাটে?
আমার হাতে একটা লিস্ট। চিরকুটই। লেখাঃ
শোনো,
এগুলো আনার ব্যবস্থা কোরো:
১। আই ওয়ান্ডার- আন্নাকা হ্যারিস
২। দ্য ইয়ার অফ লিভিং ডেঞ্জারাসলি- ক্রিস্টোফার কোচ
৩। আলু – ২ কেজি
৪। পটল- হাফ কেজি (ফ্রিজে রাখাটা তো আবার তোমার ভালো লাগে না)
৫। রাধুনি সুগন্ধী সজ- যতটুকু পারো (বাজারে পাওয়াই তো ভার)
আর হ্যা, প্লিজ চোখটা একটু দেখিয়ে এসো। এক বছর তো হয়ে গেছে চেক আপের। চশমার অর্ডারও দিয়ে এসো। ব্যস্ত হোয়ো না। সাবধানে রাস্তায় চলাফেরা কোরো।
আজকের বইটার জন্য ধন্যবাদ। তুমি এত জানো! এক বালিশে শুয়েও বিশ্বাস হতে চায় না।
তোমায় ভালোবাসি বোকাপোঁকা।
Leave a comment