আমার স্কুলজীবন অবিস্মরণীয় ছিল, এই অর্থে যে যা আমার বেড়ে ওঠায় ভূমিকা রাখে তা আমি সহজে ভুলি না, কিন্তু সে জীবন বিশেষ কিছু ছিল না। আমি মাইক্রো-মেধাবী ছিলাম, কৌতুহলে হয়ত ম্যাক্রো। একটা কাজেই আমি নিয়মিত ছিলাম, যার কোনো সামাজিক সীকৃতি নেই আমাদের মত দেশে, তা হলো- আমি চিন্তা করতাম। আমিও শুধু নিজের কাছেই বিশেষ ছিলাম, অন্যদের কথা বলব না, কারণ অন্যদের ধারণা আপনার ধারণার সাথে খুব কম সময়েই মিলবে, যখন আপনি নিজের কাছে বিশেষ আর অন্যদের চোখে ভিন্ন হয়ে উঠবেন। অন্যরা আপনার ভেতর যে বিশেষ সম্ভাবনা ও সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছে বলবে, তা আপনি হয়ত রীতিমত অপমানজনক ভাববেন। আমার বয়ঃসন্ধির শেষ ভাগে এই ধরণের অতিসামাজিক সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমার এক যুগ বয়সি এই ধরণের অক্টোপাশ থেকে কারই মুক্তি নেই, তা তিনি লালন হউন, বা গৌতম। মুক্তি একান্তই উপলব্ধিগত, চেতনঋদ্ধ- যা কথা ও কাজে প্রকাশ পেলেই বাকিরা জানতে পারে।
আমার প্রজন্ম অতীতের সকল প্রজন্মকে নোংরামী-গোড়ামী-অন্ধতায় হার মানানো প্রজন্ম, দেশের উত্তরজাত প্রজন্মের কাছে আমারটা যেমন পরাজিত। এটাই স্বাধীনতাত্তোর দেশের ইতিহাস। প্রতিটা প্রজন্মেই কিছু প্রজন্মবিরোধী থাকে- আমি তাদের একজন। ঠিক এ কারনেই, কলেজ জীবনের পরে, আমি আমার সকল স্কুল ও কলেজ এর তৎকালিন বন্ধু ও সহপাঠীদের বিদায় দেই, আমার স্রোতোবিরোধী পথচলার টাইমলাইন থেকে। যে তরুন-যুবকদের আলোচনার মূল বিষয় থাকত পর্ণ-পাকিস্তান-ক্রিকেট-কদাচার, কখনও গতানুগতিক ক্যারিয়ার, আবার সাপ্তাহিক প্রার্থনা শেষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বন্ধুকে আদর করে *** বলে গালি দেয়া, মেয়েদের বাজে ইঙ্গিত করা সেসব তরুনই আমাকে অবাক করে দিত ধর্মের আলোচনায় মুখে ফেনা তুলে, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখার ব্যক্তিত্ব আমার কখনই ছিল না। আজ যেমন বুদ্ধিহীন সেলফিজমে আক্রান্ত ট্রেন্ডি ছেলে-মেয়েরা জানে না, তারা সময়ের সাথে সাথে নিজেকেই হারাচ্ছে, নিজেকে না জানা-বোঝা-ভালবাসার আগেই। আমার সততা, সাহসিকতা, আত্মপ্রেম, আত্মবিশ্বাস ও অস্তিত্বের সংঘাত, হতাশা, একাকিত্ব, পরাধীনতার যন্ত্রণা অতঃপর সৃজনশীলতায় মুক্তি ও সমৃদ্ধির সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়া- এই সবকিছুর সাথে আমার ঐ সীদ্ধান্তটির যোগ আছে। আমি এখনও অবাক হই- কিভাবে পারলাম-সবার থেকে নিজেকে দূরে রাখতে! হয়ত আমি চিন্তা করতাম তাই, বা আমি অন্তত আমার চিন্তায় সৎ ছিলাম তাই। হয়ত আমি ভালকে ভালো আর খারাপকে খারাপ বলতে পারতাম তাই।
চিন্তা নিয়ে আরেক দিন কথা হবে। কলেজ জীবনের পর আমি বছর পাঁচেক একেবারেই নিজেকে দিলাম। বলতে গেলে প্রায় সব প্রথাগত সমাজ-সম্পর্ক-কর্ম থেকে দূরে। একে বলে ঘরের অন্ন ধ্বংস করা। আপনি রাস্তায় গিয়ে বখাটেপনা করেন, নেশা করেন, নোংরামী করেন সমস্যা নেই যতক্ষন না আপনি সামাজিক। ধর্ম ও কর্ম করুন, তা লোক দেখানোর জন্য হলেও, তাহলেই আপনি সামাজিক। আমি শুধু পরিবারের অন্ন ধ্বংস করার ক্ষেত্রেই সামাজিক ছিলাম। এই কর্পোরেট যুগে সবকিছুর অর্থলগ্নিতা আছে। তা সে কর্ম হোক, বা সম্পর্ক। আমি না এই যুগের, না এই প্রজন্মের। তাই, এই অনর্থক অর্থসর্বস্বতা থেকে বাঁচতে আমি লেখালেখি শুরু করলাম। দেখলাম পাঠকদের ভেতরে সব ধরণের প্রাণি আছে, যাদের আমি বর্জন করেছি- তাদের মত আছে, যাদের আমি বর্জন করব- তাদের মত আছে, যারা আমার জীবনের সাথে আত্মিক হবেন তারাও আছেন। ভাজ্ঞিস তারা ছিলেন, নাহলে ভার্চুয়াল লেখালেখির জগৎ থেকেও আমাকে হয়ত দূরে থাকতে হত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই হাতে গোনা দুজন মানুষ, যাদের ভূমিকা আমার গত অর্ধ যুগের পথচলাকে সবচেয়ে বেশি দৃঢ় করেছে, তাদেরকে আমার পরিবার দেখতে পারে না। যেন আমার এই দূরে থাকাটার নিমিত্ত এই দুজন মানুষ। এই অসীম কসমসে দূরত্ব কখনই মূল বিষয় হবে না, যদি আমরা কিভাবে সম্পর্ক করতে হয়, কিভাবে যত্ন নিতে হয় জানি। আমি পিতা, আমার টাকা আছে, আমি টাকা দিলাম- ব্যস, দায়িত্ব শেষ। আমি মা, খাওয়ালাম-পরালাম-পরিস্কার করলাম- ব্যস, তুমি চির ঋণি। আমি ভাই-বোন, পথদ্রষ্টা, পথ দেখালাম, সাহায্য করলাম, সহ্য করলাম- ব্যস, অনেক করেছি। দেয়া-নেয়ার অর্থনৈতিক সংজ্ঞা যেমন আছে, আরও গভীরে গেলে পদার্থবিজ্ঞানীয় ব্যাখ্যাও আছে। এসব অবদান আলাদা করে উল্লেখ করাটা, এসবকে বিশেষ কিছু মনে করাটা সম্পর্কের শেকড়হীনতাকেই প্রকাশ করে।
পারিবারিক শেকড়হীনতা আমাদের দেশের শেকড়-অস্বীকারের সংস্কৃতির সাথেই সংযুক্ত। এহেন দেশে আর মানুষ সমাজ তৈরি করে না, সমাজ সবাইকে তৈরি করে। সমাজ সবাইকে সামাজিক করে। সমাজ আমাকেও তৈরি করতে সদা স্বচেষ্ট, তাই আমি অসামাজিক।
গত অর্ধ যুগের পথচলায় আমি হাতে গোনা কয়েকটা সম্পর্কে সম্মান-স্বাধীনতা-সহমর্মিতা পেয়েছি, আমি আজ সেসব মানুষকে ধন্যবাদ দেই, যারা আমাকে সত্য করেছেন, সুন্দর করেছে্ন সকল রকম সামাজিক-আর্থিক স্বার্থহীনতায়, ধর্ম ও সমাজের উর্ধে থেকে।
ধন্যবাদ প্রিয়তমা- প্রিয় পথ চেনারা,
ধন্যবাদ প্রিয় বোন মিনার্ভা-নেফারতিতি-হার না মানারা,
ধন্যবাদ প্রিয় ভাই-মতি-নিয়াজ-কাওসার- জীবন সংগ্রামী সৈনিকেরা,
ধন্যবাদ প্রিয় উদ্দোমী ম্যাডাম, প্রিয় আল-আমিন-পাহাড়ী প্রু-শিশির-মিরাজ-বোকারা, ধন্যবাদ।।
Leave a comment